সম্মেলন ছাড়া কমিটি নয়

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ-

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আ.লীগের কমিটি পর্যবেক্ষণে ৮ সাংগঠনিক টিম
কোনোভাবেই বিতর্কিতদের আশ্রয়-প্রশ্রয় নয়
‘মাই ম্যান’ বা এমপিদের প্রভাব চলবে না
যেসব জেলায় সমস্যা আছে, তা মেটানোর তাগিদ

এখন থেকে সম্মেলন ছাড়া তৃণমূলের কোনো ইউনিটেই কমিটি করা যাবে না। আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী ও ভাতৃপ্রতীম সংগঠনকে প্রেস রিলিজ নির্ভর কমিটি দেয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। যেখানে ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রয়োজন হবে, সেখানে ভোটের মাধ্যমেই কমিটি করতে হবে। সব পর্যায়ের কমিটিতে দুর্দিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের প্রাধান্য দিতে হবে। কোনো কমিটিতেই ‘মাই ম্যান’ সংস্কৃতি প্রশ্রয় দেয়া হবে না। প্রতিটি ইউনিটে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের একক কোনো নিজস্ব বলয় থাকবে না। বলয় ভাঙতে হবে। যেসব কমিটি জমা হয়েছে, সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ যাছাইবাছাই করেই নির্ভেজাল পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয়া হবে। আওয়ামী লীগসহ দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রায় ৭ মাস পর গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এমন কঠোর নির্দেশনা দেন তিনি। গণভবনে সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ বৈঠক চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। ৮১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির মধ্যে ৩০ জন সদস্য গতকালকের সভায় অংশ নেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকের শুরুতেই সূচনা বক্তব্য রাখেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত সম্মেলন ও ‘মাই ম্যান’ সংস্কৃতি পরিহার করে ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের কমিটিতে ঠাঁই দেয়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেন দলীয় প্রধান। সভায় ৮টি সাংগঠনিক বিভাগের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের সমন্বয়ে ৮টি টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমে সমন্বয়ক থাকছেন বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা। এছাড়া সভাপতি ও সম্পাদকম-লীর সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্যরা এই টিমে আছেন। বিকালে ৮টি বিভাগীয় টিমের সদস্যদের নামের তালিকা প্রকাশ করেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বৈঠকসূত্র জানায়, গতকালের সভায় দুজন সাংগঠনিক সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন না। তারা দুজনেই সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বাকি ৬ জন সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন চট্টগ্রাম, বি এম মোজাম্মেল হক খুলনা, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন রংপুর, এস এম কামাল হোসেন রাজশাহী, মির্জা আজম ঢাকা এবং এডভোকেট আফজাল হোসেন বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। এসময় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ঢাকা বিভাগের আওয়ামী লীগের নাজুক অবস্থার কথা

তুলে ধরে বলেন, ঢাকা সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল বিভাগ। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে সমস্যা বেশি। ৪ বছরে কোনো একটি থানায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। আগামীতে কমিটি যেন সঠিক সময়ে করা হয়, সেজন্য দলীয় প্রধানের সহযোগিতা ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এসময় সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠন করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করতে হবে। বিকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তৃণমূলের সব কমিটি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে গঠন করার কথা পূর্ণব্যক্ত করে বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন হলে মাঠের লোকরাই নেতা হবেন। আর সম্মেলন ছাড়া হলে লবিংয়ে বা তদবিরের লোক নেতা হয়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনের ওপরই জোর দিয়েছেন।

সভায় উপস্থিত সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক তার বক্তব্যে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের বিগত কমিটির নেতাদের ডেকে পাননি বলে সভায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাদের বারবার ডাকলেও তারা সাড়া দেননি। সে কারণে থানাগুলোতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে কে কোথায় কী সমস্যা ফেস করছে, সেটা আমাকে অবহিত করবে। আমি চাই তৃণমূলে দলের পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীসহ সমাজে যারা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষজন আছে তাদেরও দলে টানতে হবে। তোমরা কাজ করতে গিয়ে, কমিটি করতে গিয়ে কোথাও কী সমস্যা হচ্ছে তা আমাকে জানাবে। দলে সাধারণ সম্পাদক আছে তাকেও জানাবে।

সভায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন তার বক্তব্যে বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রস্তাবিত কমিটিতে সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও বেশকিছু সম্পাদকীয় পদে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তারা অনেকেই ঢাকার ভোটার নয়। ভোটের সময় তাদের পাওয়া যায় না। নিজ নিজ এলাকায় চলে যান। তাছাড়া এবার প্রস্তাবিত কমিটিতে ঢাকা নয়, বেশিরভাগ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ করে বলেন, এতে ভোটের সময় সংকট সৃষ্টি হয়। এসময় কমিটিতে ঢাকার ভোটারদের প্রাধান্য দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি তার প্রস্তাবটি সমর্থন করে বলেন, স্থানীয় ও ত্যাগীদের দিয়ে কমিটি করতে হবে। অনেক জেলায় সমস্যা রয়েছে। সেগুলো দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে হবে। নেতার ‘মাইম্যান’ বা এমপিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কমিটি করা যাবে না।

সভায় নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। জেলার শীর্ষ দুই নেতার বিরোধে অনেক হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী কমিটিতে ঢুকেছে, তাদের চিহ্নিত করে কমিটি থেকে বাদ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরোধ নিরসনেও সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় আওয়ামী লীগের কমিটি না থাকায়, সেখানে দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়।

৮ বিভাগে টিমে আছেন যারা : এদিকে গতকালকের সভায় তৃণমূলে সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ৮ টিম অনুমোদন দিয়েছেন। বিকালে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার সরকারি বাসভবনে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব টিম অনুমোদনের তালিকা প্রকাশ করেন।

রংপুর বিভাগ : টিম সমন্বয়ক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। এই বিভাগে আরো রয়েছেন সভাপতিম-লীর সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন ও শাজাহান খান। এছাড়া থাকছেন এস এম আশিকুর রহমান, এডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া ও এডভোকেট সফুরা বেগম।

রাজশাহী বিভাগ : টিম সমন্বয়ক ড. হাছান মাহমুদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। এই বিভাগে আছেন সভাপতিম-লীর সদস্য আব্দুর রহমান। বাকি সদস্যরা হলেন ডা. রোকেয়া সুলতানা, নুরুল ইসলাম ঠান্ডু, মেরিনা জাহান ও বেগম আখতার জাহান।

খুলনা বিভাগ : টিম সমন্বয়ক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক। সভাপতিম-লীর সদস্য থাকছেন কাজী জাফরউল্যাহ ও পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য। অন্য সদস্যরা হলেন হাবিবুর রহমান সিরাজ, আমিরুল আলম মিলন, পারভিন জামান কল্পনা ও গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা।
বরিশাল বিভাগ : টিম সমন্বয়ক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেন। বাকি সদস্যরা হলেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন, গোলাম কবির রাব্বানী চিনু ও আনিসুর রহমান।

ঢাকা বিভাগ : সমন্বয়ক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি ও সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। সভাপতিম-লীর সদস্যরা হলেন ড. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান ও এডভোকেট আব্দুল মান্নান খান। বাকি সদস্যরা হলেন আবদুস সোবহান গোলাপ, দেলোয়ার হোসেন, মৃণাল কান্তি দাস, শামসুন্নাহার চাপা, মেহের আফরোজ চুমকি, সিদ্দিকুর রহমান, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, এডভোকেট কামরুল ইসলাম, এ বি এম রিয়াজুল কবির কাওছার, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু, এডভোকেট সানজিদা খানম, শাহাবুদ্দিন ফরাজী ও মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।

ময়মনসিংহ বিভাগ : টিম সমন্বয়ক ডা. দীপু মনি ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। এ টিমে সভাপতিম-লীর সদস্য আছেন মতিয়া চৌধুরী। বাকি সদস্যরা হলো অসীম কুমার উকিল, মারুফা আক্তার পপি ও উপাধ্যক্ষ রেমন্ড আরেং।

সিলেট বিভাগ : সমন্বয়ক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক। এই টিমে আরো আছেন সভাপতিম-লীর সদস্য এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও নুরুল ইসলাম নাহিদ। অন্য সদস্যরা হলেন ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী ও সায়েম খান।

চট্টগ্রাম বিভাগ : টিম সমন্বয়ক মাহবুব উল আলম হানিফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। এই টিমে আছেন সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মতিন খসরু। অন্য সদস্যরা হলেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওয়াসিকা আয়েশা খান, ফরিদুন্নাহার লাইলী, ড. সেলিম মাহমুদ, সুজিত রায় নন্দী, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর, হারুনুর রশীদ, আমিনুল ইসলাম আমিন ও দীপংকর তালুকদার।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের অপশনে ক্লিক করুন

More News Of This Category